ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ , ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
কৃষিখাত লাভজনক করতে প্রণোদনা দিতে হবে: রাষ্ট্রপতি আশুলিয়ায় শারমিন গ্রুপের কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ৩ অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তির সাক্ষাৎ সার সংকটে ১১ দলীয় জোটের এমপিদের হাত থাকতে পারে: মীর শাহে আলম গ্রাম-শহরে শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে প্রেরণ, পাচার চক্রের ২ সদস্য আটক তরুণদের চোখে চোখ রেখে কথা বলার স্বাধীনতা দিতে হবে: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চট্টগ্রামে সাইবার পুলিশ সেন্টারের শুভ উদ্বোধন : ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সিআইডির নতুন মাইলফলক সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদের জানাজায় অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী রায়পুরায় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত, অগ্নিনির্বাপণ মহড়া দেশে আটকে পড়া সৌদি প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ নিয়ে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণাসহ ছয় দফা দাবি সাদপন্থিদের যুক্তরাষ্ট্রে ড. ইউনূসকে হেনস্তা, হাসিনাকে দায়ী করলেন জামায়াত আমির ডিম উৎপাদন বাড়িয়ে রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী চুরির অপবাদে শিশুকে নির্যাতন, কীটনাশক পান করে হাসপাতালে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ আদালত গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে: আইনমন্ত্রী ডেঙ্গু নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে পাড়া-মহল্লায় মাইকিংয়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর সন্ত্রাসী কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় আ.লীগের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ নেই: তথ্য উপদেষ্টা দুর্গাপূজায় চালের বরাদ্দ বাড়ালেন প্রধানমন্ত্রী: এমপি ফয়সল জার্মান পর্যটকের উদ্ধার ল্যাপটপ হস্তান্তর করেছে পুলিশ

ডেঙ্গুতে নিভছে সুখের আলো, বাবার ছবি হাতে ভবিষ্যৎ খুঁজছে শিশুরা

  • আপলোড সময় : ১৫-১০-২০২৬ ০১:২৫:৫৭ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৫-১০-২০২৬ ০১:২৫:৫৭ অপরাহ্ন
ডেঙ্গুতে নিভছে সুখের আলো, বাবার ছবি হাতে ভবিষ্যৎ খুঁজছে শিশুরা

ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছে পরিবারের প্রিয়জনকে। কোথাও বাবার ছবি দেখে তাঁকে খুঁজে ফিরছে অবুঝ সন্তানেরা, কোথাও একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে চোখের জলে দিন কাটাচ্ছেন বৃদ্ধ বাবা-মা। আবার কোথাও সাধ্য অনুযায়ী চিকিৎসা করিয়েও প্রিয়জনকে বাঁচাতে পারেননি স্বজনেরা। ডেঙ্গুর কারণে এসব পরিবারে নেমে এসেছে শোক, অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা।

মুন্সিগঞ্জে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো কয়েকটি পরিবারের চিত্র এমনই। প্রিয়জন হারানোর বেদনার পাশাপাশি অনেক পরিবারকে এখন সামলাতে হচ্ছে আর্থিক সংকট এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সরেজমিনে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের বিনোদপুর বড়বাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো স্কুলশিক্ষক রফিকুল ইসলাম রুবেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান। মুঠোফোনে বাবার ছবি দেখে তাঁকে খুঁজে ফেরে অবুঝ দুই শিশুর চোখ।

বাবার ছবি হাতে দুই সন্তান, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

গত ১৭ আগস্ট ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ৩২ বছর বয়সে মারা যান বিনোদপুর রামকুমার উচ্চবিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন ইংরেজি শিক্ষক রফিকুল ইসলাম রুবেল। তাঁর গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার ফাঁসিয়াতলা গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের সেলিম মোল্লার ছেলে।

রুবেলের স্ত্রী হোসনেয়ারা আক্তার নিপা একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। তিনি জানান, ২০১১ সালে পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়। বড় ছেলে রাফি বড় হয়ে চিকিৎসক হবে—এমন স্বপ্ন দেখতেন রুবেল।

কিন্তু বাবাকে হারিয়ে মাত্র ১১ বছর বয়সেই সেই স্বপ্নের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া রাফি।

নিপা বলেন, দুই সন্তান—ছেলে রাফি ও দেড় বছরের মেয়ে রাহাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল তাঁর স্বামীর। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ডেঙ্গুর ভয়াবহতা তাঁদের সুখের সংসারের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাঁর।

তিনি আরও বলেন, স্বামী বেঁচে থাকতে বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। এখন সেই ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিজের সামান্য আয় দিয়ে পরিবার চালাতে হচ্ছে তাঁকে। সরকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে সন্তানদের ভবিষ্যৎ কিছুটা হলেও নিরাপদ করা সম্ভব হবে বলে আশা করেন তিনি।

চার বছরের রাইসার মাথায় নেই মায়ের হাত

বিনোদপুর বড়বাড়ি এলাকায় শুধু রুবেলের পরিবার নয়, ডেঙ্গুতে স্বজন হারিয়েছে আরও কয়েকটি পরিবার। স্থানীয়দের ভাষ্য, শুধু আগস্ট মাসেই ওই এলাকায় ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।

তাঁদের একজন প্রবাসী জিমেলের স্ত্রী ফাতেমা খাতুন মিম (২২)। বিয়ের মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় ডেঙ্গুতে প্রাণ হারান তিনি। মাকে হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে তাঁদের চার বছরের মেয়ে রাইসা মনি।

মিমের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর শাশুড়ি মোসাম্মৎ ঝর্ণা বেগম। তিনি জানান, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর মিম নয় দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ দিন একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি ছিলেন। পরে তাঁর মৃত্যু হয়।

ঝর্ণা বেগম বলেন, মিমের অকালমৃত্যুতে পরিবারে অন্ধকার নেমে এসেছে। চার বছরের নাতনি রাইসা মনিকে নিয়ে এখন তাঁদের দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়।

একই পরিবারের ১৮ জন আক্রান্ত, প্রাণ গেল বাবার

বিনোদপুর বড়বাড়ি এলাকার একই বাড়িতে গত আগস্টে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান অবসরপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্য মোহাম্মদ শাহজালাল (৫৫)।

তাঁর ছেলে শাহাবুদ্দিন বলেন, একই সময়ে পরিবারের ১৮ জন সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তাঁর বাবা। পরিবারের অভিভাবককে হারিয়ে তাঁরা ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছেন।

শাহাবুদ্দিন বলেন, বাবা না থাকায় তাঁরা দুই ভাই ও এক বোন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছেন। সাজানো সংসারে ডেঙ্গু এভাবে কষ্ট নামিয়ে আনবে, তা তাঁরা কখনো ভাবেননি।

তিনি আরও বলেন, গত জুলাই থেকেই বিনোদপুর বড়বাড়ি এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি না থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কেউ না কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

শাহাবুদ্দিনের অভিযোগ, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উদাসীনতা ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। আগামী বছর ডেঙ্গু ও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আগেভাগেই কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

আগস্টে সর্বোচ্চ ৭৪৮ জন আক্রান্ত

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মুন্সিগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রকোপ মাসে মাসে বেড়েছে। জানুয়ারিতে আক্রান্ত হন ১১ জন, ফেব্রুয়ারিতে পাঁচজন এবং মার্চে চারজন। এরপর এপ্রিলে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ জনে। মে মাসে ৩৫ জন এবং জুনে ১৫১ জন আক্রান্ত হন।

জুলাইয়ে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। ওই মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ৪৯৫ জন। আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৪৮ জনে, যা এ বছরের মাসভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ। সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত হন ৬৪০ জন।

অক্টোবরের প্রথম ১৫ দিনে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন ১৫৭ জন ডেঙ্গু রোগী। বর্তমানে সদর হাসপাতাল ও পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মিলিয়ে ভর্তি রয়েছেন অন্তত ৬৩ জন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন দুজন। তবে বেসরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ১০ বলে দাবি করা হচ্ছে। জেলার বেসরকারি ২২৫টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তথ্য সরকারি হিসাবের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের দাবি

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মুন্সিগঞ্জের দুটি পৌরসভা ও ৬৭টি ইউনিয়নে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। তাঁদের দাবি, এ কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

সর্বশেষ সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভাকে ডেঙ্গুর বিস্তার ও সংক্রমণের হটস্পট হিসেবে ঘোষণা করেছিল জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট এলাকায় লিফলেট বিতরণ ও মাইকিংয়ের বাইরে কার্যকর পদক্ষেপ তেমন দেখা যায়নি।

ডেঙ্গুতে প্রাণহানি কমাতে আগামী বছরের জন্য আগাম প্রস্তুতি, নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ

মানবিক দিক বিবেচনায় জেলায় ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মুন্সিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. সাজেদা বেগম।

তিনি বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সিভিল সার্জন আরও জানান, সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দল ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি—এমন ছয়টি এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। তিন দিন ধরে বিভিন্ন স্থানের পানির নমুনা, আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তের নমুনাসহ প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষাগারে এসব নমুনা বিশ্লেষণের পর ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

ডেঙ্গুতে প্রিয়জন হারানো পরিবারগুলোর কাছে এখন শোকের পাশাপাশি বড় হয়ে উঠেছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ, সংসারের ব্যয়ভার ও আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। তাঁদের অভিজ্ঞতা বলছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি।


নিউজটি আপডেট করেছেন : gbanglanews

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
শিশু উদ্ধার, ঘুষ প্রত্যাখ্যান ও ছিনতাইকারী আটক: পুরস্কৃত ৩ আনসার

শিশু উদ্ধার, ঘুষ প্রত্যাখ্যান ও ছিনতাইকারী আটক: পুরস্কৃত ৩ আনসার